শুক্রবার ৩০ জানুয়ারী ২০২৬ - ১৩:৫৭
মার্কিন যুদ্ধনীতি ও ইরানের শান্তির ধারণা: একটি বিশ্লেষণাত্মক গবেষণা: তাকি আব্বাস রিজভী 

ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা কেবল সাম্প্রতিক রাজনীতির ফল নয়, বরং এর শিকড় প্রোথিত একশতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা কেবল সাম্প্রতিক রাজনীতির ফল নয়, বরং এর শিকড় প্রোথিত একশতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসে।
১৯০৮ সালে ইরানে তেল আবিষ্কারের পর ব্রিটেন ক্বাজার শাসকদের সাথে চুক্তি করে অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানির মাধ্যমে ইরানের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তেল আয়ের ৮০% এর বেশি বিদেশী শক্তির হাতে চলে যায়, অন্যদিকে ইরান পায় তার সম্পদের সামান্য অংশ। এই অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপই ছিল সেই বীজ যা পরবর্তীতে বিপ্লব ও প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে।
১৯২৫ সালে ক্বাজার শাসক আহমদ শাহকে অপসারণ করে রেজা শাহ পাহলভি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে তার পুত্র মোহাম্মদ রেজা পাহলভি শাহ হন। ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে ব্রিটিশ তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ বাড়তে থাকে, এবং এই অসন্তোষই সিআইএ ও এমআই৬-এর পরিকল্পনার পথ সুগম করে।
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব ছিল শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির স্বৈরাচারী শাসন, পশ্চিমা প্রভাব ও তীব্র সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক প্রবল জনপ্রতিক্রিয়া।
ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে জনগণ "না পূর্ব, না পশ্চিম, ইসলামি প্রজাতন্ত্র" স্লোগান তুলে এবং "বেলায়াতে ফাকিহ" বা ইসলামি আইনবিদের তত্ত্বভিত্তিক ইসলামি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও জনগণের সার্বভৌমত্ব কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
যদি যুদ্ধ ও শান্তির দৃষ্টিকোণ থেকে উভয় দেশের নীতি পরীক্ষা করা হয়, তবে পার্থক্য স্পষ্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তার সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে ইরান জোর দেয় তার স্বাধীনতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমাধানের উপর।
বলা অত্যুক্তি হবে না যে, ইরান সবসময় এমনকি হুমকি ও আগ্রাসনের চরম পরিবেশেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন পুরোপুরি মেনে তার শত্রুদের হুমকির মুখে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, ইরান কখনই সেই শক্তির সামনে মাথা নত করবে না যারা তাকে ধ্বংস করতে চায়। ইরানি নেতৃত্ব বারবার জোর দিয়েছে যে তারা যুদ্ধের পক্ষে নয়, বরং শান্তিকামী এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তি ইরানের প্রতিরক্ষা নীতি, বিশেষ করে এর পারমাণবিক কর্মসূচি ও মধ্যপ্রাচ্যে ভূমিকাকে হুমকি হিসেবে দেখে। আর এই হুমকি বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মনগড়া স্বপ্নের ব্যাখ্যা বৈ কিছু নয়...
যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ, যেমন ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইউক্রেন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ইত্যাদির যুদ্ধ শুধুমাত্র বিশ্ব শান্তির জন্যই বিপজ্জনক নয়, বরং মানবিক ট্র্যাজেডিও প্রমাণিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ফাওয়াজ জিরজিসের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন হস্তক্ষেপ ১৯৪০-এর দশকের শেষ থেকে অব্যাহত রয়েছে, এবং ইরানের ওপর চাপ এই দীর্ঘমেয়াদী নীতির একটি স্পষ্ট উদাহরণ। আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতা শুধুমাত্র তেল চুক্তি নিয়ে নয়, বরং এই শত্রুতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ইসলাম এবং সেখানকার বিপ্লব। যেমনটি সূর্যের আলোর মতো প্রতিটি জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে স্পষ্ট যে, ইরানি বিপ্লবের পর, ইরান ইসলামি ব্যবস্থাকে ভিত্তি করে এবং ঘোষণা করে যে তারা "না পূর্ব, না পশ্চিম" নীতি অনুসরণ করবে, অর্থাৎ স্বাধীনতা ও ইসলামি মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেবে। এই আদর্শ যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধর্মনিরপেক্ষ ও পশ্চিমা শাসন ব্যবস্থার দেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ ছিল, কারণ: পশ্চিমা প্রভাব সীমিতকরণ: ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে চেষ্টা করে, যা মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী ছিল।
ধর্মভিত্তিক পৃথক পরিচয়: ইরান বিশ্বে ইসলামি নীতি-ভিত্তিক স্বাধীনতার উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য একটি আদর্শগত চ্যালেঞ্জ ছিল।
আঞ্চলিক প্রভাব: ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান এই অঞ্চলে ইসলামি আন্দোলনের সমর্থন করে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাদের নিজস্ব প্রভাবের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। সুতরাং, বিশ্বের প্রতিটি ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির এটি মনে রাখা উচিত: "নিশ্চয়ই আপনি ইহুদী ও মুশরিকদেরকে মুমিনদের চরম শত্রু হিসেবে পাবেন..." (কুরআন ৫:৮২)। যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের সাথে শত্রুতা শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইসলাম ও ইসলামি ব্যবস্থার আদর্শিক পার্থক্যও এই উত্তেজনার একটি বড় কারণ।
এখানে এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, যুক্তরাষ্ট্র কেন বিশ্বের প্রতিটি কোণে হস্তক্ষেপ করে, যখন তার নিজের জনগণ জীবনধারণের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা থেকে বঞ্চিত?

এর কয়েকটি বড় কারণ নিম্নরূপ:
১. ক্ষমতা ও স্বার্থ
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তার স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করে। তেল, বাণিজ্যিক পথ, অস্ত্র বিক্রয় ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ তাকে অন্যান্য দেশে হস্তক্ষেপে উৎসাহিত করে।
২. রাজনৈতিক ও সামরিক শিল্প
যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ একটি বড় শিল্পও বটে। অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানি, সামরিক চুক্তি ও শক্তিশালী লবি যুদ্ধ থেকে লাভবান হয়, অন্যদিকে সাধারণ জনগণ খুব কমই এর সুবিধা পায়।
৩. জনগণের সমস্যা উপেক্ষা
লক্ষ লক্ষ আমেরিকান গৃহহীন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা অসহনীয় পর্যায়ে ব্যয়বহুল এবং অনেকেই খাদ্যের জন্য সংগ্রাম করে। জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ সামরিক বাহিনী ও যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করা হয়, জনকল্যাণের বদলে।
৪. ভয়ের রাজনীতি
প্রায়শই জনগণকে বোঝানো হয় যে যদি বিদেশে হস্তক্ষেপ না করা হয় তবে হুমকি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে যাবে। এই ভয়ের মাধ্যমেই হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া হয়।
বাস্তবতা হলো, সাধারণ আমেরিকান জনগণও যুদ্ধ চায় না, এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষও চায় না। সিদ্ধান্ত নেয় কয়েকটি ক্ষমতাশালী মহল, কিন্তু ক্ষতি বহন করে সর্বদা সাধারণ মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই তার জনগণের সমস্যা—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়বিচার—এ মনোযোগ দেয় তবে বিশ্ব আরও শান্তিপূর্ণ হতে পারে। এর প্রভাব কেমন হবে:
• যুদ্ধে হ্রাস: বাজেট জনগণের জন্য ব্যয় হলে যুদ্ধের জন্য সম্পদ ও রাজনৈতিক যৌক্তিকতা কমবে।
• বৈশ্বিক উদাহরণ স্থাপিত হবে: যুক্তরাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে অন্যান্য দেশের ওপর চাপ দেওয়ার বদলে উদাহরণের মাধ্যমে প্রভাব ফেলবে।
• ঘৃণা ও চরমপন্থায় হ্রাস: শক্তিশালী দেশের আগ্রাসন কমলে প্রতিক্রিয়াও কমবে।
• সাধারণ মানুষের সুবিধা: শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয়, আফ্রিকা, এশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্ররাও শান্তি ও নিরাপত্তা অনুভব করবে।
মূল সমস্যা আমেরিকান জনগণ নয়, বরং সেই ব্যবস্থা যা ক্ষমতা, অস্ত্র ও স্বার্থকে মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। যদি বিশ্বে মানুষকে কেন্দ্রে রাখা হয়, তবে যুদ্ধ স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে এবং শান্তি শক্তিশালী হবে।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha